সাহু সিজদা দেওয়ার সঠিক নিয়ম ও কখন করতে হয় জেনে নিন
নামাজের মধ্যে অনিচ্ছাকৃত ভাবে যদি কেউ ওয়াজিব ভুলে যায়, সে ক্ষেত্রে সাহু সিজদা দিতে হবে। তাই সাহু সিজদা দেওয়ার সঠিক নিয়ম সম্পর্কে হয়তো অনেকেই জানেন না। চলুন, কিভাবে সাহু সিজদা দিলে সঠিক হবে সে সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।
অনেকেই বিভিন্ন ধরনের চিন্তাভাবনা করতে গিয়ে দেখা যায় নামাজের মধ্যে ওয়াজিব ছুটে গেছে, সে ক্ষেত্রে তিনি বুঝতে পারেন না কি করবেন। তাই এর জন্য সাহু সিজদা দিতে হবে। তাই সাহু সিজদা দেওয়ার সঠিক নিয়ম সম্পর্কে জানার জন্য আর্টিকেলটি মনোযোগ দিয়ে পড়ুন।
পোস্টসূচিপত্রঃসাহু সিজদা দেওয়ার নিয়ম ও কখন করতে হয় জেনে নিন
সাহু সিজদা দেওয়ার সঠিক নিয়ম
নামাজের মধ্যে বিভিন্ন কারণে অনেক সময় ওয়াজিব ছুটে যায়, সে ক্ষেত্রে সাহু সিজদা দিতে হয়। তাই সাহু সিজদা দেওয়ার সঠিক নিয়ম সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। চলুন, নিম্নে এ সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে জেনে নেওয়া যাক।
আপনি নামাজ পড়তে গিয়ে যদি নামাজের কোন ওয়াজিব ভুলে যান, এই নামাজের ক্ষেত্রে দুটি এই সিজদা দিতে হবে। তবে ইচ্ছাকৃতভাবে যদি ভুল করে থাকেন সেক্ষেত্রে নামাজ হবে না। আবার নামাজ পড়তে হবে। কিন্তু ফরজ নামাজে যদি কোন ফরজ ভুলে যান সে ক্ষেত্রে নামাজ পুনরায় পড়তে হবে।
এই সিজদা সাধারণত নামাজ শেষের বৈঠকে দিতে হয় কিন্তু আপনি যদি একেবারে নামাজ শেষ করে সাহু সিজদা দেন সে ক্ষেত্রে নামাজ হবে না।
মহান আল্লাহ তা'লা ইসলামের প্রতিটি বিধান সুন্দরভাবে সাজিয়েছেন এবং মানুষের কাছে খুবই সহজ করে দিয়েছেন। নামাজ আল্লাহর একটি বিধান যা আমাদের ওপর অবশ্যই পালন করা কর্তব্য। তাই এর প্রতি উদাসীন হওয়া যাবে না, অবশ্যই সচেতন হতে হবে।
মনোযোগ সহকারে নামাজে পড়তে হবে এবং নামাজের প্রতি যত্নশীল হওয়া লাগবে। নামাজের প্রতি কখনো ইচ্ছাকৃত ভুল করা যাবে না। এক্ষেত্রে আপনার নামাজ কিন্তু হবেনা।
তবে অনিচ্ছাকৃত ভাবে যদি আপনি কোন ওয়াজিব ভুলে যান, সে ক্ষেত্রে এই সিজদা দেওয়া যাবে। যেহেতু নামাজের ভিতরে যে কাজগুলো করা হয় সেগুলো ওয়াজিব। যেমন সূরা ফাতেহা পড়া, এর সাথে আরেকটি সূরা মিলিয়ে পড়া, ফরজের ধারাবাহিক ঠিক রাখবেন।
৪ রাকাত বিশিষ্ট নামাজে দ্বিতীয় বৈঠকে আপনি এই সিজদা দিবেন, প্রতিটি বৈঠকে তাশাহুদ পড়া। তবে অনিচ্ছাকৃতভাবে যদি ছুটে যায় সে ক্ষেত্রে নামাজের শেষে দুটি অতিরিক্ত সিজদা দিবেন।
সাহু সিজদার নিয়মঃ নামাজের শেষ বৈঠকে তাশাহুদ পড়ার পর ডান দিকে সালাম ফিরাবেন। এরপরে অন্যান্য সিজদার মত দুটি সিজদা দিবেন। তারপরে পুনরায় আবার তাশাহুদ সহ দরুদ শরীফ দোয়া মাসুরা পড়ে দুই দিকে সালাম ফিরাবেন। তাহলেই আপনার এই ভুলটা ঠিক হয়ে যাবে, এতে পুনরায় নামাজ পড়া লাগবে না।
যদি কোন ব্যক্তি তিন বা চার রাকাত বিশিষ্ট নামাজের প্রথমবার দ্বিতীয় রাকাতে ভুল করে থাকে সেই ক্ষেত্রে তিনি প্রথম বৈঠকে আদায় করা যাবে না। ডান দিকে সালাম ফিরে এই সিজদা দিবেন এরপর আবার তাশাহুদ এবং দোয়া মাসুরা পড়ে ও দুই দিকে সালাম ফিরাবেন।
তবে ওয়াজিব ইচ্ছা করে যদি ছেড়ে দেন সেই ক্ষেত্রে আদায় করলে হবে না। পুনরায় পড়া লাগবে কারণ এই সিজদা হলো অনিচ্ছাকৃত ভুল। তাই যে ব্যাক্তি ইচ্ছা করে ভুল করে সেক্ষেত্রে তার নামাজ হবে না এবং সাহু সিজদা দেওয়া যাবে না।
সাহু সিজদা কাকে বলে
নামাজের মধ্যে ভুল ত্রুটি হলে আমরা সাহু সিজদা দিয়ে থাকি। তাই সাহু সিজদা কাকে বলে? এ সম্পর্কে জানা প্রয়োজন, বিস্তারিতভাবে জেনে নেওয়া যাক।
নামাজের মধ্যে কিছু জরুরী বিষয় রয়েছে যেগুলো ভুল হলে তার ক্ষতি পূরন হিসেবে নামাজ শেষে দুটি সিজদা দিতে হয়। মূলত এই সিজদাকে সাহু সিজদা বলে থাকে। ইসলামের দৃষ্টি কোণে এই সিজদা দেওয়া ওয়াজিব।
ইমরান ইবনে হুসাইন রাঃ হতে বর্ণিত 'নবী করীম সাঃ তাদেরকে নিয়ে নামাজ পড়তে ছিলেন, তিনি নামাজের মধ্যে ভুল করেছিল, তারপরে দুটি সিজদা করলো, তারপর তাশাহুদ পাঠ করে সালাম ফিরে নামাজ শেষ করেছিল।' তিরমিজি শরীফ হাদিসঃ ৩৯৫
সাওবান রাঃ হতে বর্ণিত নবী করীম সাঃ বলেছেন, সালাম ফিরানোর পরে দুটি সেজদা করতে হবে। আবু দাউদ হাদিসঃ ১০৩৮
এখানে যে ভুলটির কথা বলেছেন তা হলো সুন্নাত ও মুস্তাহাব এর কথা কিন্তু বলা হয় নাই বরং নামাজের কোন ফরজ ভুলক্রমে যদি ছুটে যায় সে ক্ষেত্রে আদায় করার কথা বলা হয়েছে অথবা নামাজের কোন ওয়াজিব যদি ছুটে যায় সে ক্ষেত্রে আদায় করতে হবে।
সাহু সিজদা কখন করতে হয়
অনেকেই হয়তো জানে না যে সাহু সিজদা কখন করতে হয়? তাই এ সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। তাহলেই আপনি বুঝতে পারবেন সাহু সিজদা কখন দিতে হবে। চলুন, এ বিষয়ে বিস্তারিতভাবে জেনে নেওয়া যাক।
'নামাজের মধ্যে কোন ওয়াজিব কাজ যদি ভুল করে ছেড়ে দেন, তাহলে সিজদায় সাহু দেওয়া ওয়াজিব।' বুখারি হাদিসঃ ৩৮৬
'ফরজ,নফল, বিতর বা যেকোনো নামাজের যে কোন রাকাত সূরা ফাতেহা পড়া ভুলে গেলে সে ক্ষেত্রে এই সিজদায় দেওয়া ওয়াজিব।' মুসলিম শরীফ, হাদিসঃ ৮৯৩
'ফরজ নামাজের যদি প্রথম দুই রাকাতে কেরাত পড়তে না পারেন তাহলে দ্বিতীয় দুই রাকাতে কেরাত পড়ে নিতে হবে। তবে নামাজের ধারাবাহিকতা ঠিক রাখতে হবে।' মুসলিম শরীফ, হাদিস নাম্বার ৮৯৫
কেউ যদি এক সেজদা করে পরের রাকাতের জন্য দাঁড়িয়ে যায় তখন ওই দুই রাকাত সিজদা দিয়ে সম্পন্ন করে ছুটে যাওয়ার সেজদা একসঙ্গে মিলিয়ে দিতে হবে। তখন এক রাকাতে সেজদা হয়ে যাবে শেষে সেজদা করবে এতে করে নামাজ হবে।
'যদি তিন বা চার রাকাত বিশিষ্ট নামাজের প্রথমে ভুলে হয়, তা যে কোন নামাজ হতে পারে তারপরও এই সিজদা দিতে হবে।' আবু দাউদ হাদিস নাম্বার ৮৮২
'তাশাহুদ পড়তে যদি ভুলে যান সেই ক্ষেত্রে এই সিজদা দিতে হবে।' নাসাঈ হাদিস নাম্বার ১২৪৩
'বিতর নামাজের তৃতীয় রাকাতে দোয়া কুনুত পড়া লাগবে, যদি ভুলে যান সে ক্ষেত্রে এই সিজদায় দিতে হবে।' বাইহাকি, হাদিস নাম্বার ৪০৪২
প্রথম বৈঠক তাশাহদের সঙ্গে দরুদ ইত্যাদি না পড়লে তাহলে এই সিজদা দিতে হবে। মুসলিম শরীফ হাদিস নাম্বার ৮৯৫
সাহু সিজদা দিতে ভুলে গেলে করণীয়
নামাজে ভুলের কারণে এই সিজদা দিতে হয় কিন্তু যদি ভুলে যান তাহলে কি করবেন। তাই সাহু সিজদা দিতে ভুলে গেলে করণীয় সম্পর্কে চলুন নিম্নে বিস্তারিত ভাবে আলোচনা করা যাক।
ভুলক্রমে যদি সাহু সিজদা না করে নামাজ শেষ করেন সে ক্ষেত্রে এই সিজদা আদায় করা যাবে। সালাম ফেরানোর পর নামাজ এর ভিতর যদি কথাবার্তা, মসজিদ থেকে বের হয়ে না যান, সাহু সিজদা দেওয়া যাবে।
কেননা হাদীস শরীফে আসছে যে যতক্ষণ পর্যন্ত বের না হবে এবং কোন শব্দ না করে সে ক্ষেত্রে সাহু সিজদা আদায় করতে হবে কিন্তু যদি মসজিদে বের হয়ে যান এবং শব্দ করেন তাহল আর সাহু সিজদা দেওয়া যাবে না, পুনরায় নামাজ পড়তে হবে।
সালাতে বেশি রুকু হয়ে গেলে সাহু সিজদা দিলে হবে কি
অনেকে প্রশ্ন করে থাকে যে সালাতে বেশি রুকু হয়ে গেলে সাহু সিজদা দিলে হবে কি? এ সম্পর্কে চলুন বিস্তারিতভাবে জেনে নেওয়া যাক।
নামাজের মধ্যে আপনি যদি অতিরিক্ত রুকু দিয়ে ফেলে সেক্ষেত্রে এই সিজদা দিতে হবে না এবং পুনরায় নামাজ পড়া লাগবে না। আবার অতিরিক্ত সিজদা দেয় এইজন্য তার নামাজ বাতিল হবে না। তিনি সালাত শেষে সাহু সিজদা দিলেই হয়ে যাবে। তাহলে তার সালাত হয়ে যাবে নতুন করে আর নামাজ পড়তে হবে না কিন্তু রুকু যদি ছুটে যায় কিংবা কম হয় সে ক্ষেত্রে সেটা পড়ে নিতে হবে।
ফরজ নামাজে সাহু সিজদা
ফরজ নামাজে যদি ভুল হয় সেক্ষেত্রে সাহু সিজদা দিবেন কিভাবে। তাই ফরজ নামাজে সাহু সিজদা সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। চলুন বিস্তারিতভাবে জেনে নেওয়া যাক।
নামাজেদের মধ্যে তিন ধরনের ভুল হলে সরাসরি সেজদা দেওয়া ওয়াজিব। প্রথম হল নামাজের মধ্যে যদি কেউ কোন ওয়াজিব ছেড়ে যায় অথবা ফরজ কাজ বৃদ্ধি করে ফেলে, তাহলে তার সাহু সিজদা করতে হবে।
দ্বিতীয় রাকাতে সালাম ফিরিয়ে ফেলছেন যেমন চার রাকাত বিশিষ্ট নামাজ যদি হয় সে ক্ষেত্রে চতুর্থ রাকাতে সালাম ফেরাতে হয় কিন্তু দ্বিতীয় রাকাতেই সালাম ফিরেছেন, সেই ক্ষেত্রে এই সিজদা দিতে হবে।
কোন কারনে নামাজের ওয়াজিব বা রোকনের ক্ষেত্রে ভুলে যান তখন এই সন্দেহ দূর করার জন্য এই সিজদা দেওয়া যেতে পারে। মনে করেন তৃতীয় রাকাত আদায় করছেন কিনা আপনার মনে পড়ে না তখন তিনি দ্বিতীয় রাকাত ধরে নিয়ে তৃতীয় রাকাত নিশ্চিত করবেন এবং সাহু সিজদা দিতে হবে।
শেষ কথাঃ সাহু সিজদা দেওয়ার নিয়ম ও কখন করতে হয় জেনে নিন
পরিশেষে বলা যায় যে নামাজ আমাদের উপর ফরজ করা হয়েছে। তাই এই নামাজ পড়ার সময় আপনার সকল মানসিক টেনশন কে দূর করে দিয়ে নামাজের প্রতি খুবই মনোযোগ সহকারে নামাজ পড়তে হবে। যেন নামাজের মধ্যে ভুল না হয়।
আর যদি ভুল হয়ে যায় সে ক্ষেত্রে সাহু সিজদা দিতে হবে। তাই সাহু সিজদা দেওয়ার সঠিক নিয়ম সম্পর্কে আর্টিকেলে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে, আশা করি বুঝতে পারবেন। পোস্টটি ভাল লাগলে আপনার বন্ধু-বান্ধবের নিকট শেয়ার করবেন। ধন্যবাদ
এম আর মাহমুদ ওয়েবসাইটের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url